বন্ধুদেরকে নিয়ে বেড়াতে যমুনাদিঘী

তাপস মিত্রঃ বাঙালীরা বরাবরই হুজুগে এবং ভ্রমণপ্রিয়। আমরাও তার ব্যাতিক্রম নই। 20.09.18 ইং কিছু স্কুলের বন্ধুদেরকে নিয়ে বেড়াতে গেছিলাম যমুনাদিঘী – ভাল্কিমাচান, সাথে ছিল সজল, দেবরাজ, কৌশিক,আরো তিন বন্ধু যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু শেষ মূহুর্তে কিছু সমস্যা এসে পড়াতে তারা আর যেতে পারেনি ….. আড্ডাবাজদের এই আড্ডামুখর ট্যুর টাকে আরো আনন্দময় করে তুলতে মাঝপথে যোগ দিয়েছিল প্রকাশ ।

মছলন্দপুর থেকে সকল 05:35 এর ট্রেন ধরে পৌছে গেলাম বিরাটি সজলের ফ্ল্যাটে এক কাপ চা খেয়ে সাতটা নাগাদ সজলের স্যান্ট্রো নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ডানকুনি পার হয়েই গাড়ি উড়তে শুরু করল, চার চাকার গতি বাড়ছে ধীরে ধীরে আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমাদের আড্ডা। গাড়ীর গতি আর আমাদের আড্ডায় পরিবেশ জমজমাট আর বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। বর্ধমানের আগে এক জায়গায় দাড়ালাম সকালের টিফিন করার জন্য। লুচি, আলুর তরকারি আর আচার দিয়ে পেট পূজো করলাম এগুলো কৌশিক বাড়ি থেকে নিয়ে এসছিলো কৌশিকের বউ অপর্না আমাদের সবার জন্যে পাঠিয়েছিল।

দূর্গাপুর এক্সপ্রেস ধরে গুসকরার মোড়। এখান থেকে ডানদিকে টার্ন করে 13-14 কিমি দুরের অভিরামপুর বাজার। ওখান থেকে বাঁ দিকে 2-3 কিমি রাস্তা পার করে বাঁ দিকে West Bengal Fisheries Development এর কমপ্লেক্স। www.wbsfdc.com ওয়েব সাইট থেকে আগেই অনলাইন বুকিং করা ছিল যমুনাদিঘীর আম্রপালি বাংলো,বাংলোর ম্যানেজারের ফোন নম্বর -9434154833 (সুব্রত গুহ)।অফিস ঘরে বুকিং এর কাগজপত্র এবং পরিচয় পত্র দেখিয়ে এন্ট্রি সেরে চলে এলাম আমাদের জন্যে নির্ধারিত রুমে। এখানে 8 টা ডবল বেডের Ac ঘর, 1 টা তিন বেডের Ac আর কিছু Non Ac ঘর আছে।Ac ঘর Rs 1200/-, তিন বেডের Ac বেড প্রতি Rs 450/- ,তিন বেডের Non Ac Rs 800/- । একটু ফ্রেশ হয়েই আমরা জয়গাটা পরিক্রমায় বের হলাম। এখানে আছে মাছেদের প্রজনন কেন্দ্র আর অনেক গুলো মাছ ভরা দিঘী, আম কাঁঠালের ছাওয়ায় ঘেরা। আমরা অপেক্ষা করছিলাম প্রকশের জন্য কিন্তু প্রকাশ ফোনে জানিয়ে দিল চারটের আগে আসতে পারবে না। অগত্যা আমরা ডাইনিং হলের দিকে পা বাড়ালাম।আগেই ফোনে খাবারের অর্ডার নিয়ে নিয়েছিলো।খাবার দাবার মান বেশ ভালোই l কাতলা মাছ দিয়ে মিল Rs 100 /-, চিকেন মিল Rs120/-।দুপুরের খাওয়াটা সেরে একটু বিশ্রাম নিতে নিতে ঠিক চারটের সময় প্রকাশ হাজির।

সাড়ে চারটে নাগাদ নিজেদের গাড়িতে করে চারিদিকে গাঢ় সবুজ ধানে ভরা ক্ষেত পেরিয়ে ভাল্কিমাচান পৈছেলাম,আম্রপালি থেকে ভাল্কিমাচানের দূরত্ব কম বেশি 6-7 কিমি হবে। এই ভাল্কিমাচান জায়গাটা প্রধানতঃ মহুয়ার এক ঘন জঙ্গল যেখানে এক সময় অনেক ভালুক দেখা যেত যারা মহুয়ার মধু খেতে এখানে আসতো । এখন আর তাদের খুব একটা দেখা যায় না ।এখানে আছে একটা লম্বা 4 টি উঁচু পিলার এর মতন স্থাপত্য, যার নীচে গোপন সুড়ঙ্গ আছে যার মুখটি একটি লোহার রেলিঙের মতন ব্যারিকেড করে পেতে দেওয়া আছে। ইংরেজ আমলে স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীরা ওই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করতেন বলে জানা যায় ।সন্ধ্যা নেমে গেছে। তাই কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে ফেরার পালা।এখান থেকে অভিরামপুর বাজারে পৌঁছে কিছু টুকিটাকি কেনাকাটা করতে করতে প্রবল বেগে বৃষ্টি নামল আর দেরী না করে সোজা ফিরে এলাম রুমে।

একটু ফ্রেশ হয়েই আবার বসলো জমাটিয়া আড্ডা, আড্ডা আর আড্ডা। বৃষ্টি ততোক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে ।রূমের সামনে বসে আড্ডা মারার সুন্দর ছিমছাম ব্যবস্থা আছে। সেখানে বসেই আড্ডা দিতে দিতেই গরম গরম চিকেন পকোড়া সহযোগে গল্পগুজব চললো।চিকেন কষা আর গরম গরম রুটি দিয়ে রাত্রের খাবার খেয়ে এবার ঘুমাতে যাবার পালা। সারাদিনের ঘোরাঘুরি ক্লান্ত সকলে। কখন যে ধীরে ধীরে একে একে সবাই নরম বিছানার আদরে ঘুমের দেশে চলেগেলাম কেউ বুঝতেই পারিনি।

পরদিন ভোর 5 টায় ঘুম থেকে উঠে আবার বেরিয়ে পরলাম। বিরাট জায়গা। দিঘী গুলোতে ছোটো বড় সব সাইজের রুই কাতলা সহ নানা রকমের মাছ আছে জলের মধ্যে মছের এর লাফালাফি দেখার মত, মনে হচ্ছে জল ফুটছে।রুমে ফিরে এসে জমিয়ে চা পান করে সবাই সকাল সকাল স্নান সেরে নিলাম ।লুচি/রুটি আর আলুর তরকারির সাথে একটা করে ডিমের আমলেট খেয়ে এবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ডোকরা শিল্পের গ্রাম দেখতে। গুসকরার দিকে যেতে ডোকরা শিল্পের গ্ৰাম ,যমুনাদীঘি থেকে প্রায় 8 কিমি দূরে দারিয়াপুরে ডোকরা গ্ৰামে পৈছেলাম।ডোকরা হল “হারনো মোম ঢালাই” পদ্ধতিতে তৈরি একটি শিল্প কর্ম। এই শিল্পের ইতিহাস প্রায় 4000 হাজার বছরের পুরানো।ডোকরার নানা গয়না, দেবতার মুর্তি ও ঘর সাজাবার বিভিন্ন জিনিষ তৈরি করে। ডোকরা শিল্পের কাজ Rs 50/- থেকে শুরু করে Rs 10000/- পর্যন্ত আছে ।

দারিয়াপুরে ডোকরা গ্ৰামে থেকে ফিরে এসে প্রকাশ আর দেরি করলো না ও রওনা দিল ওর অফিসের কাজে শান্তিনিকেতন এর উদ্দেশ্যে।আম্রপালি কমপ্লেক্সে প্রবেশদ্বারের মুখেই শান্তিনিকেতনের শাড়ি, গয়না, ঘর সাজানোর জিনিস এছাড়া ডোকরা সামগ্রীও কেনাকাটা করার ব্যবস্থা রয়েছে। এখন থেকে দুই একটা জিনিস কিনে ফেললাম। তারপর দুপুরের
খেয়ে দেয়ে বাড়ি ফেরার পালা।

অনেকটা মজার স্মৃতি আর স্নিগ্ধ প্রাণবায়ু নিয়ে ফিরে এলাম যা স্মৃতির ফ্রেমে থেকে যাবে চিরদিন….কথায় বলে, ‘দিন যায় কথা থাকে’। কথা থাকুক বা নাই থাকুক ফেলে আসা অতীত দিনগুলোর স্মৃতি চিরদিন হৃদয়ের মানসপটে অমস্নান হয়ে থাকবে।

সব ছবি মোবাইলে তোলা

**প্লাস্টিক পদার্থের নিয়মিত ব্যবহার দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অপচনশীল এ পদার্থ পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে। ফলে মাটি, জল দূষিত হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টকারী প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ বর্জন করুন..পরিবেশ রক্ষা করার দায়িত্ব আমার আপনার আমাদের সকলের**

দেশ ও এই সময়

24×7 NATIONAL NEWS PORTAL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *