সাপের কামড়ের হাত থেকে বাঁচার পরই দেশ জুড়ে শুরু হলো নতুন উৎসব – ধনতেরাস

পরাক্রমী রাজা হিম বা হিমার মনে শান্তি নেই। বিবাহযোগ্য পুত্রের বিবাহ তিনি কীভাবে দেবেন! তাঁর বংশ কি তবে এখানেই শেষ! রাজ জ্যোতিষ রাজকুমারের জন্মকুণ্ডলী বিচার করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন—‘বিয়ের চতুর্থ দিন রাতে কাল সাপের কামড়ে রাজকুমারের মৃত্যু হবে।’ তাই শয়নে স্বপনে জাগরণে রাজার ভাবনার শেষ নেই।
অনেক চিন্তার পর রাজা ছেলের বিয়ে দিলেন কনেদের রাজ জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী বলেই। বিয়ের চতুর্থ রাত যথাসময়ে এসে গেল। রাজপুত্রকে নববধূ ঘুমতে দিলেন না। তিনি করলেন কী—নিজের সব মহামূল্যবান সম্পদ ঘরের দরজার সামনে স্তূপাকার করে রাখলেন। বাড়ির সব জায়গা প্রচুর প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল করলেন। সেই আলো মূল্যবান রত্নের ওপর পড়ে তার ছটায় চতুর্দিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। আর নিজে রাজকুমারকে কখনও গল্প বলে বা কখনও গান শুনিয়ে জাগিয়ে রাখলেন।
রাত ক্রমশ গভীর হতে লাগল। জগৎ নিদ্রামগ্ন। কালরূপী যম কালসর্পরূপে রাজগৃহে নিঃশব্দে প্রবেশ করলেন। কিন্তু দরজার সামনে আলোর জ্যোতিতে তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে নতুন বউয়ের গলায় মিষ্টি গানের মাদকতায় হারিয়ে ফেললেন সময়ের জ্ঞান। যখন তাঁর চেতনা ফিরল দেখলেন ভোর হচ্ছে—চতুর্থ রাত অতিক্রান্ত—কাল পরাজিত।
দেশজুড়ে শুরু হল নতুন বউয়ের বন্দনা। সেই তিথিটা ছিল কার্তিকের কৃষ্ণ ত্রয়োদশী। সেই দিন থেকেই শুরু হয় ধন সমৃদ্ধির জন্য লক্ষ্মী আরাধনা— নাম ধনত্রয়োদশী বা ধনতেরস।


অন্য একটি কিংবদন্তি অনুসারে, এই দিনে মা লক্ষ্মী ও ধন্বন্তরি সমুদ্র মন্থনের সময় আবির্ভূত হন। সেই দিনটিও ছিল কার্তিক মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশী। মারাঠিরা দিনটিকে বলেন ধনত্রয়োদশী। কেউ আবার ধন্বন্তরি ত্রয়োদশীও বলেন। রাজস্থানে এটিই আবার ‘ধনতেরস’।


লক্ষ্মীর বহুরূপ। তিনি আদ্যা শক্তি। তিনিই সমস্ত সম্পদ— সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্যময়ী। তিনিই আবার নবশক্তির অধিশ্বরী—বিভূতি, উন্নতি, কান্তি, হৃষ্টি, কীর্তি, সন্নতি, ব্যুষ্টি, উৎকৃষ্টি ও ঋদ্ধি।
আমরা তাই মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করি, সব সৌভাগ্য সম্পদ। কাতর প্রাণে বলি, ‘এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে, আমার ঘরে থাক আলো করে।’ কথায় বলে, ‘ধনে পুত্রে লক্ষ্মীলাভ হোক।’ মা লক্ষ্মীর এই আরাধনায় পুত্র সন্তান লাভও হয়।
সুস্বাস্থ্য মানুষের সব থেকে বড় সম্পদ। সেই মহা সম্পদটি পাওয়ার জন্য এই বিশেষ দিনটিতে আয়ুর্বেদাচার্য ধন্বন্তরিও মা লক্ষ্মীর সঙ্গে পূজিত হন।


ঋদ্ধির দেবী লক্ষ্মী আসেন সিদ্ধির দেবতা গণেশের হাত ধরে। তাই লক্ষ্মী আরাধনার সঙ্গে গণেশ, সরস্বতী ও কুবেরের পুজো করতে হয়। ধন সম্পদ রক্ষার্থে ধনাধক্ষ কুবেরের থেকে বেশি উপযুক্ত আর কে-ই বা হতে পারেন।
জগতের সব সৌভাগ্য-সম্পদের অধিশ্বরী লক্ষ্মীদেবী। তাই তিনি স্বর্গে ইন্দ্রের পরম সম্পদরূপা স্বর্গলক্ষ্মী, মর্ত ও পাতালে রাজগৃহে রাজলক্ষ্মী, গৃহস্থের গৃহে গৃহলক্ষ্মী। সুগৃহিণীর মধ্যে তাঁরই শক্তি ও প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়—তিনি গৃহীর পরম ধন সম্পদ স্বরূপ, পরম মঙ্গলকারিণী, গোধন-গাভিমাতা সুরভি, তিনিই আবার যজ্ঞপত্নী দক্ষিণা, সূর্যের দ্যুতি, চন্দ্র ও পদ্মের শোভা, সব শস্যে, বস্ত্রে, সব শুদ্ধ ও পরিষ্কার স্থানেই তাঁর অধিষ্ঠান। সূর্য ও আকাশ পদ্মস্বরূপ—মা তাই ‘পদ্মাসনা, পদ্মালয়া পদ্মলক্ষ্মী’।
প্রাচীন গ্রাম বাংলায় একটি ঘরোয়া কর্ম করা হতো গৃহে লক্ষ্মী আনার জন্য। যা আজও চলে আসছে। কাজটা এই রকম—সন্ধ্যার সময় গৃহে প্রদীপ দিয়ে সেই আগুন থেকে প্যাঁকাটি বা আরও কাঠ জ্বালাতে হবে। তারপর সেটা তিনবার মাথার ওপরে ঘোরাবার সময় প্রার্থনা করতে হবে ‘আমার/ আমাদের সব অমঙ্গল অনিষ্ট নাশ হোক।’ প্রার্থনা একটাই লক্ষ্মী যেন আমার ঘরে অচঞ্চলা থাকেন। স্কন্দপুরাণে দিনটি পালন করতে বিশেষ কিছু দিক নির্দেশ করা হয়েছে। মন্দির, চৌরাস্তা, নদী, গৃহ অভ্যন্তর ও ঘরের ভিতর, গাছতলা, গোয়ালঘর, রান্নাঘর প্রভৃতি জায়গায় প্রদীপ দিতে হয় লক্ষ্মী লাভের জন্য। দরিদ্রকে অন্নদান করতেও হয়। প্রিয়জন, প্রতিবেশীকে মিষ্টি বা অন্য উপহারও দেওয়া হয়।
সারা বাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। আবর্জনা মুক্ত যেন থাকে গৃহের প্রতিটি স্থান। সুগন্ধে ও বিভিন্ন বর্ণে গৃহকে চিত্রিত করতে হয়। দক্ষিণ ভারতে অষ্টলক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়— আদিলক্ষ্মী, ধান্যলক্ষ্মী, বীরলক্ষ্মী, গজলক্ষ্মী, সন্তানলক্ষ্মী, বিজয়ালক্ষ্মী, ঐশ্বর্যলক্ষ্মী ও ধনলক্ষ্মী।
ধনতেরসের সন্ধ্যা বা প্রদোষকালে মা লক্ষ্মীর আরাধনাই মুখ্য। সব অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা করে সারাটা বাড়িতে প্রদীপ জ্বালিয়ে করা হয় আলোকময়। প্রধান দরজা রঙিন আলো ও রঙ্গোলি দিয়ে সুন্দর করে সাজাতে হয়। উদ্দেশ্য ঋদ্ধিদাত্রী লক্ষ্মীদেবীর কৃপা লাভ।
সন্ধ্যায় ঠাকুরঘর, তুলসীতলা ও বাড়ির প্রধান দরজায় প্রদীপ জ্বালাতে হয়। এই সময় মন্ত্রের মাধ্যমে যে প্রার্থনা জানানো হয়, তাতে একদিকে মা লক্ষ্মী উর্জিত বিগ্রহ অপর দিকে অর্জিত ঋদ্ধিমূর্তি প্রকাশিত হয়। ধনতেরসে লক্ষ্মী আরাধনার ফল অনন্ত।
মহামুনি অগস্ত্য মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনায় বলেছেন— মা লক্ষ্মী তুমিই মাতা-পিতা, তুমিই ভাই-বন্ধু-বিদ্যা। তুমিই জগদ্ধাত্রী। তুমিই জগৎমাতা, দারিদ্র্য থেকে আমাকে মুক্ত কর মা।
মহাভারতের শান্তি পর্বে কালজয়ী উপদেশে বলা হয়েছে মানুষের দারিদ্র্য পাতক স্বরূপ। ধনহীন জ্ঞানী হলেও তার মত অপাংক্তেয়। ফলহীন বৃক্ষকে যেমন পক্ষীকুল পরিত্যাগ করে সেইরূপ ধনহীন মানুষকে পুত্র মিত্র, বন্ধু-বান্ধব সবাই ত্যাগ করে। ‘ধনহীনের ধর্ম নাহি হয়।’ তাই চাই অনেক অর্থ, চাই প্রাচুর্যতা। তা দিয়ে সন্তানকে রক্ষা করেন মা ধনলক্ষ্মী।
অভাব, দারিদ্র্য কোনও মানুষের জীবনকে যখন অভিশাপগ্রস্ত করে হতাশার শেষ সীমায় নিয়ে যায়, তখন পরিষ্কার শুদ্ধ পরিবেশে, পবিত্রভাবে স্মরণাগতি, শ্রদ্ধা-ভক্তি সহকারে ধনদাত্রী লক্ষ্মীদেবীর পুজো ও স্তব পাঠে মেলে কাঙ্ক্ষিত ফল।
ভক্তের মনোবাঞ্ছা অনুসারে পার্থিব-ধন, ঐশ্বর্য, জমি, বাড়ি ও সব ধরনের সম্পদ প্রভৃতি প্রদান করেন মা লক্ষ্মী। পাশাপাশি তাঁর প্রসন্নতায় পাওয়া যায় পরমার্থিক রত্ন সম্পদ।
স্বাহা ও স্বধারূপী যিনি বেদমাতা অদিতিও তিনি। বসুন্ধরা, শুদ্ধস্বত্ত্বস্বরূপা নারায়ণী লক্ষ্মীদেবী ছাড়া বিশ্ব শবতুল্য। ধর্ম-অর্থ-কাম ও মোক্ষ প্রদয়িনী দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা মানুষের একমাত্র গতি। সেই আদ্যাশক্তি লক্ষ্মীরূপে দেবতাদের, অন্নপূর্ণা রূপে স্বয়ং শিবকেও ত্রাণ করেছেন।
লক্ষ্মী আরাধনা গৃহের শুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতায় এবং সৎ হিংসাশূন্য মনে করতে হয়। মা লক্ষ্মী স্তব স্তুতি প্রিয়া। ভক্তি ভরে তাঁকে ঘিয়ের প্রদীপ দিয়ে আরতি করে স্তব পাঠ করলে মা সন্তানের প্রতি প্রসন্ন হন। তার গৃহে হন চঞ্চলা। প্রদান করেন সব সম্পদ-ঐশ্বর্য এবং প্রকৃত মনুষ্যত্ব।
নারায়ণ ছাড়া লক্ষ্মী ও লক্ষ্মী ছাড়া নারায়ণ থাকেন না। লক্ষ্মী নারায়ণময়। লক্ষ্মী আরাধনার সঙ্গে নারায়ণের আরাধনাও করতে হয়। তবেই লক্ষ্মীদেবীর পূর্ণ কৃপা লাভ হয়।
সহস্রনাম পাঠে কলিতে সম্পূর্ণ পুজোর ফল পাওয়া যায়। এটা শাস্ত্র বাক্য। তাই পবিত্র পরিবেশে ধূপ ও দ্বীপ জ্বালিয়ে লক্ষ্মীদেবী ও শ্রীবিষ্ণুর সহস্রনাম স্তব পাঠ করলে মা লক্ষ্মী বেশি প্রসন্না হন এবং গৃহে চিরকাল বিরাজ করেন। ভক্তকে তাঁর অদেয় কিছুই থাকে না।
লেখাপড়ায় উন্নতি, জ্ঞান অর্জন, সন্তান কামনায় লক্ষ্মী আরাধনার শাস্ত্রীয় বিধান আছ। এছাড়া রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, সর্বজনমান্যতা লাভের জন্য রাজলক্ষ্মীর পুজো করা যায়। এমন বিধানও শাস্ত্রে আছে।
তাই সব শেষে করজোড়ে পরমশক্তিময়ী-মঙ্গলময়ী-করুণাময়ী মা লক্ষ্মীদেবীর কাছে প্রার্থনা করি— ‘রাজ্যং দেহি শ্রিয়ং দেহি বলং দেহি সুরেশ্বরী।/ কীর্ত্তিং দেহি ধনং দেহি যশঃ কান্তিঞ্চ দেহি মে।।/ কামং দেহি মতিং দেহি ভোগান্ দেহি হরিপ্রিয়ে।/ জ্ঞানং দেহি চ ধর্ম্মঞ্চ সর্ব্বসৌভাগ্যমীশ্রিমত্।।’— রাজ্য-ঐশ্বর্য শক্তি দাও মা সুরেশ্বরী। দেহ কান্তি দাও, কীর্তিমান কর ধনদান করে যশস্বী কর। শুভ চিন্তা ও শুভ কর্ম দাও মা হরিপ্রিয়ে। জ্ঞান দাও, ধর্ম দাও, আর দাও সর্বসৌভাগ্যময় তোমার আশ্রয়।
ওঁ শ্রীকৃষ্ণায় অর্পণমস্তুঃ।

দেশ ও এই সময়

24×7 NATIONAL NEWS PORTAL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *