নৈহাটির ‘বড় মা’ – জানুন তাঁর মহিমা

নৈহাটীর মানুষ নৈহাটির অরবিন্দ রোডের ২২ ফুট,চলতি কথায় ১৪ হাতের বড় কালীকে ‘বড় মা’ বলেই ডাকেন। শুধু নৈহাটি নয় সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এখানকার মা বড় মা নামেই পরিচিতা।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য করা দরকার যে নৈহাটির সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে প্রাচীন আর সবচেয়ে শ্রদ্ধার কালীপুজো এটি এতটাই শ্রদ্ধার যে, বড় মা বিসর্জনের আগে শহরের আর কোনও ঠাকুরের বিসর্জনই হয় না। সবার আগে পথ ছেড়ে দেওয়া হয় তাঁকে। কাল ছিল নৈহাটির ‘বড় মা’ কালী পুজোর খুঁটি পুজো। পূর্ণ লগ্নে প্রতি বছরের মতো এবারও লক্ষ্ণী পুজো দিন খুঁটি পুজো দিয়ে সূচনা হলো ‘বড় মা’র পুজো প্রস্তুতি।
অপেক্ষার আর ১৪ দিন।

“ধর্ম হোক যার যার বড়মা সবার”

নৈহাটি বড়ো কালীর সেবাপুজার ইতিহাস ও মহিমা সম্বন্ধে বলতে গেলে বলতে হয়
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে এই পুজোর শুভ সূচনা হয়েছিল। ১৯২০ সালে স্বর্গীয় ভবেশ চক্রবর্তী মহাশয়ের বাড়ীর বিপরীতে ক্যাওড়া পাড়ায় প্রতি বছর রক্ষা কালী পুজো হতো। ক্যাওড়ারাই এই পুজোর দায়িত্ব পালন করতো।তখন এই মাতৃ প্রতিমার বিগ্রহটি উচ্চতায় ছোটো ছিল।পুজোর শেষে মাকে মিষ্টি ও ডাবের জল দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হতো।কোনো অন্নপ্রসাদ নিবেদন করা হতো না সেই সময়। এই ভাবেই সেই সময় থেকে মায়ের আরাধনা কোন মতে করা হতো। ১৯২৭ সালে ভবেশ চক্রবর্তী ও তার চারজন বন্ধু,তাঁরা হলেন — রাখাল চন্দ্র দে, গদাই মোদক, প্রমথ চক্রবর্ত্তী ও ভদ্রেশ্বর পাত্র।


ভাঙ্গা রাস উৎসব উপলক্ষে নবদ্বীপ ধামে যান।
পোড়ামা তলার সুউচ্চ মহিষ মর্দ্দিনী দেবীর বিগ্রহ দেখে অভিভূত হন ভবেশ চক্রবর্তী। এরপর আরো উচ্চতা বিশিষ্ট রাধাকৃষ্ণ,কালী,শিব প্রভৃতি দেবদেবীর বিগ্রহ দর্শন করে ধন্য হন তাঁরা।
লোকশ্রুতি আছে ভবেশ চক্রবর্তী মহাশয় সিদ্ধান্ত নেন নৈহাটির যার পূর্ব নাম নবহট্ট; অরবিন্দ রোডের ভিতরে ক্যাওড়া পাড়াতেই সুউচ্চ কালী বিগ্রহ স্থাপণ করে পুজো করবেন। লক্ষ্মী পুজোর আগের দিন তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হন গঙ্গার তীরবর্তী ধর্মশালার সন্নিকটে দ্বীপান্বিতা অমাবস্যার পূণ্য লগ্নে যেনো মায়ের পুজো করা হয়। পরের দিন সকালে ব্যারাকপুরের স্বনামধন্য ভাস্কর বিশ্বনাথ পাল মহাশয় কে ভবেশ বাবু জানান সুউচ্চ কালী প্রতিমা নির্মাণের জন্য। তিনি ভবেশ বাবুর কথায় রাজী হন এবং ধর্মশালার সন্নিকটে কালী মায়ের বিগ্রহ নির্মাণ শুরু করেন। অবশেষে কালী পুজোর আগের দিন মায়ের বিগ্রহ নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়।এই কালী বিগ্রহের উচ্চতা প্রায় ২২ ফুটের ওপর ছিল। মায়ের বিগ্রহ কে রুপোর গহনা, চাঁদ মালা, খড়গ,মুন্ডুমালা ইত্যাদি পড়ানোর পরে পুজো পাঠ শুরু করা হয়। খাসবাটি নিবাসী জগমোহন আচার্য এই পুজো করেছিলেন। তারপর খিচুড়ি, অন্ন, তরকারী,পায়েস প্রভৃতি দিয়ে মায়ের ভোগ নিবেদন করা হলো। দুইদিন ধরে এই পুজো করা হয়। তার পরের দিন বিকেলে মায়ের শ্রী বিগ্রহ কে বিসর্জনের জন্য কাঁধে চাপিয়ে গঙ্গাবক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময় লোকজনের সংখ্যাও তুলনামূকভাবে অনেক কম ছিল সেই জন্য জুট মিলের লোকজন ও কুলীরা এতে সাগ্রহে অংশগ্রহণ করতো। এই ভাবেই মায়ের নিরঞ্জন সুদীর্ঘ ৫০ বছর ধরে একই রীতি অনুসারে পালিত হয়। এরপর ১৯৭০ সাল থেকে মা এর কাঠামোতে চাকা লাগিয়ে রথের ন্যায় দড়ি দিয়ে টেনে গঙ্গা বক্ষে বিসর্জন দেওয়া হতো। সেই নিয়মই এখনো পর্যন্ত পালন করা হয়ে থাকে। নিয়মের কোনো পরিবর্তন ঘটে নি। এই ভাবেই মায়ের পুজো প্রতি বছরে পালিত হতে থাকে।

কেন এই বড়ো মায়ের নামকরণ?
১৯২৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই দেবী “ভবেশ কালী” নামে সুপ্রসিদ্ধা ছিল। ২০১২ সালে অমলেশ চক্রবর্তীর দেহত্যাগের পর এই পুজো সার্বজনীন হয়ে যায়। মা কে সঠিক সময় প্রসাদ না দেওয়া , কোনো রকমে পুজো সমাপ্ত হওয়া এই নিয়ে অনেকেই মিথ্যা অভিযোগ তুলেছিলেন সেই জন্যই ভবেশ চক্রবর্তীর পরিবার থেকে এই পুজো সার্বজনীন হয়। ২০১২ সালের পর থেকে নৈহাটির মানুষেরা “বড় কালী” নামে আখ্যা দিয়েছেন।যেহেতু নৈহাটি অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন এই পুজো এবং মহা এই দেবী তাই জন্য সকলেই অন্তর থেকে “বড়মা” সম্বোধন করেন। এবার আসা যাক বড়মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা ও নিত্য পূজাপাঠ সম্বন্ধে। ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রেমচুক মারোয়ারী ধর্মশালা সমাজ বিরোধী কাজের জায়গায় রূপান্তরিত হওয়ার কারণে ২০১৩ সালে “বড়মা কমিটি” সেই স্থানটিকে ঘিরে একটি ছোটো মন্দির তৈরী করে দেন। সেখানেই নিত্য পুজো পাঠ করা হয়। কালীপুজো ছাড়াও ১১ টি অমাবস্যায় মায়ের আরাধনা হয়ে থাকে। কালীপুজোর পড়ে পূর্ণিমার দিনে সত্যনারায়ণ বিগ্রহ নির্মাণ করে পুজো করা হয়ে থেকে।

বড়ো মায়ের পুজোপর্ব ও দেবী মাহাত্ম্যের বলতে প্রথমেই বলতে হয় লক্ষ্মী পুজোর দিন কাঠামো পুজো হয়। তারপরের দিন থেকেই মায়ের বিগ্রহ নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে যায়। বর্তমানে মায়ের বিগ্রহ নির্মাণ করেন রাজু বিশ্বাস।
বিগ্রহের উচ্চতা ১৪ হাত বা ২২ ফুট।বড়ো মায়ের পুজোর জন্য কোনো চাঁদা তোলা হয় না । ভক্তদের দান করা অর্থ ও নিবেদিত অলংকারে মা পূজিতা হন। প্রণামী বাক্সে যেমন ভাবে টাকা পয়সা দেয় ভক্তরা ঠিক তেমন ভাবেই সোনা, রূপার অলংকার ও দেন। মায়ের বিগ্রহকে সোনার ও রুপোর অলংকারে সুসজ্জিতা করা হয়। সোনার পরিমাণ ১০০ ভরি এবং ২০০ কিলোর কাছাকাছি রুপো।মায়ের পরিধেয় মুকুটটিতে রুপো আছে ৪.৫ কেজি। রুপোর মুন্ডুমালা, কোমরবন্ধনী, খর্গ,শিবের মুকুট, ত্রিশুল, বিল্ব পত্র প্রভৃতি রূপো দ্বারা নির্মিত। মাকে সুসজ্জিত করার পর পুজো পাঠ শুরু হয়।


বর্তমানে বড়ো মায়ের পূজো করেন সত্যরঞ্জন চক্রবর্তী। তার হাতেই মায়ের পুজো জাগ্রত হয়েছে। কালী পুজোর দিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটে যান বড়ো মা কে দর্শন করতে। লোকশ্রুতি আছে যে যা মনস্কামনা জানান মায়ের কাছে তাই পূর্ণ করেন এই বড়ো মা। হাজার হাজার লোক একদিনে দন্ডী কাটেন এবং সিক্ত বস্ত্রে মায়ের চরণকমলে মাথা রাখেন।



এবার ভোগ নিবেদনের বিষয়—
যেহেতু পাঁচদিন বড়ো মা থাকেন তাই জন্য প্রতিদিন মোট ৫০০০ কেজির ওপর ভোগ নিবেদন করা হয়। প্রথম দিন ২০০০ কিলোর ভোগ হয়। পুরোটা রান্না করা হয় গাওয়া ঘি দিয়ে কোনো তেল ব্যবহার করা হয় না। রাতে বড়ো মায়ের ভোগে থাকে পোলাও, খিচুড়ি,লুচি, অন্ন ভোগ, পাঁচ রকম ভাজা (বেগুন, ঢেঁড়স, কুমড়ো, আলু, কাঁচকলা), চাটনি, পায়েস প্রভৃতি। পূর্ব রীতি অনুযায়ী ভবেশ চক্রবর্তী মহাশয় এর বাড়ি থেকে এই ভোগ রন্ধন করে মায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়।
সকালে কুচো ফলের নৈবেদ্য ও মিষ্টান্ন দেওয়া হয়।
সন্ধ্যায় শীতলী প্রসাদে লুচি, লাড্ডু, নাড়ু, কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া নিবেদন করা হয়।
তাছাড়া ১১ টা অমাবস্যায় ৭০০ কেজির উপর ভোগ হয়।
ভাদ্র মাসের কৌশিকী অমাবস্যায় ১৭০০ কেজি ভোগ হয়। বৈশাখ মাসে অন্নকূট উৎসব অনুষ্ঠিত হয় বড়ো মায়ের মন্দিরে। পোলাও ভোগ পর্বতসম করে তার উপর ফুল দিয়ে সাজিয়ে নিবেদন করা হয়।সেই প্রসাদ নিতে হাজার হাজার লোক ছুটে আসে মন্দিরে।



শেষে আসা যাক বিসর্জন পর্বে—
মোট চারদিন ধরে হয় পুজো। তারপরের দিন বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জনের দিন মায়ের এই সকল অলংকার খুলে রাখা হয়। তার পরিবর্তে ২ লক্ষ টাকার ফুলের সাজে সজ্জিতা হন বড়মা।
এই সাজেই মা নিরঞ্জনের পথে অগ্রসর হন।
কেবলমাত্র মায়ের ও বাবার স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত ত্রিনয়ন সহ বিসর্জন দেওয়া হয়। মায়ের মুখে পান, মিষ্টি ও জল দিয়ে বরণ করেন কমিটির সম্পাদক।
এখানকার বিশেষত্ব হচ্ছে পুরুষেরাই মায়ের বরণ করে। আর মায়ের মুখে পান পড়ে গেলে মা কে আর আটকানো যাবে না। ঠিক চারটের সময় মায়ের বিগ্রহকে টেনে নিয়ে নৈহাটির গঙ্গা বক্ষে রওনা হয়। এই ভাবে বিসর্জন দেওয়া হয়।

সেবা ও দান ধ্যান, তার মাহাত্ম্য অনেক —
বড়ো মায়ের যজ্ঞে নিবেদন করা কলা খেয়ে অনেকেই শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে জানা যায়। বড়ো মায়ের পুজোয় যে ফল নিবেদন করা হয় সেই ফল নৈহাটি মাতৃ সদন, ইমামবাড়া প্রভৃতি হাসপাতালে অসুস্থ রোগীদের মধ্যে দান করে দেওয়া হয় ।তাছাড়া বড় মায়ের কাছে ৩০-৪০ খানার বেশি বেনারসি শাড়ি পুজোতে পরে প্রতি বছর। সেই সমস্ত শাড়ি গুলো বিবাহের জন্য দুঃস্থ মহিলাদের দান করে দেওয়া হয়।এছাড়া কালীপুজোর কিছু দিন পর বস্ত্রদান উৎসব করে দরিদ্র মানুষের মধ্যে ভক্তদের নিবেদিত বস্ত্রগুলি বিলিয়ে দেওয়া হয়।
এই ভাবেই আজকে পশ্চিমবঙ্গে বড়ো মায়ের নাম দিকে দিকে প্রচারিত। যে যা মানত করেন বড়মা তার সমস্ত মনস্কামনা পূর্ণ করেন। কাউকে নিরাশ করেন না।

দেশ ও এই সময়

24×7 NATIONAL NEWS PORTAL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *