গারু সংক্রান্তী : ‘আশ্বিনের ভাত কার্তিকে খায়’

রিমি দত্ত বনিক দে

গ্রাম বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ‘আশ্বিনের ভাত কার্তিকে খায়, যেই বর মাগে সেই বর পায়’। আর এই প্রবাদের বাস্তব রূপই হলো গারু সংক্রান্তির আচার-অনুষ্ঠান। গারু সংক্রান্তি বা গারু হারকাইন। কোথাও গারু গোসল নামে পরিচিত। এ উপলক্ষে আশ্বিনের শেষ দিন নানা পদের সবজি, ভাত ও বিশেষ ডাল তৈরি করে রাখা হয়। খাওয়া হয় কার্তিকের প্রথম দিন সকালে। এ খাবারে গৃহস্থের বা সন্তানের কল্যাণ হয় ও বর চাইলে তা পূরণ হয়।

‘গারসি’ বা ‘গাস্বী ব্রত’। কোথাও কোথাও ‘গারুসংক্রান্তির ব্রত’ পুজো নামে লোকমুখে এই ব্রত আপন পরিচয় বহন করে চলেছে। আশ্বিন সংক্রান্তিতে এই ব্রত পালন করা হয়। গ্রাম বাংলার বাড়ির মেয়ে-বউরা কৃষিকাজ ও আরোগ্য লাভ ও সুস্থতার কামনায় এই ব্রত পালন করে। হেমন্তের অফলা রুক্ষ্মতাকে দূরে সরিয়ে লক্ষ্মীর আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে মশা-মাছি, কীটপতঙ্গের হাত থেকে পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করাই এমন ব্রতের উদ্দেশ্য। এক সময়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই এই ব্রত পালন করত। হৈমন্তিক ধানের শীষে দুধ সঞ্চয়নমূলক একটি অনুষ্ঠান হল এই ‘গারসি’ বা গাস্বী ব্রত। ব্রত পড়ে গ্রামের মেয়ে বউরা সমবেত কণ্ঠে গেয়ে বলে –

বুরা গিয়া ভালা আ
অলক্ষ্মীকে তাড়াইয়া লক্ষ্মী আ।
যা যা মশা মাছি উইড়া যা
আমগো বাড়িত্যে অমুকের বাড়ি যা।

এই ব্রত শুরু হয় আশ্বিন মাসের শেষ দিনের সকাল থেকে। বাড়ির নিকোন করা উঠোনের তুলসীতলাই হল এই ব্রতের আচার স্থল। হিন্দুদের মধ্যে কাকভোরে ‘গারুর’ বা ‘গারসি’-র ডাল রান্না করা মধ্য দিয়েই এই ব্রতের সূচনা করার রীতি। ব্রতের শেষে এই ডালকে প্রধান খাদ্য রেখে আহার গ্রহণ করবেন বাড়ির মেয়ে বউরা।

এই ডাল তৈরি করা হয় খেসারির ডালে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি মিলিয়ে। এগুলি হল যেমন- ঝিঙে, আলু, পটল, লাউ, গাঁটি, মুলো, কুমড়ো ডাটা, কুমড়ো ইত্যাদি। এই সব্জির উপাদান দিয়ে দেবীকে যেন বলতে চাওয়া হয় যে, বারোমাস যেন শাক-সবজি পাওয়া যায়। এই সবজির তালিকায় কচু শাক আবশ্যক। মানকচু, দুধকচু, কৃষ্ণকচু – বাংলার মাঠ ঘাটে যত ধরনের কচু পাওয়া যায় সব দেওয়ার রীতি আছে এই ব্রত পালনের আচার পদ্ধতিতে। কচুতে থাকা জৈব উপাদান রোগজীবাণুর হাত থেকে গ্রামের জন জীবনকে রক্ষা করবে এমনটাই বিশ্বাস। এই রান্না-র ডাক নাম হল আসমবারি অর্থাৎ হলুদ তেল যেখানে রান্নায় ব্যবহার হবে না। এমন আসমবারির রীতি হল সব কিছুকেই সেদ্ধ করতে হবে ডালের সঙ্গে। স্নানের আগে কাটা সবজি টুকরো দাঁত দিয়ে কেটে পিছনের না তাকিয়ে মাথার উপর দিয়ে ফেলে ছুড়ে ফেলে তারপর মনে মনে বলতে হবে ‘অলক্ষ্মী দূরে যা লক্ষ্মী ঘরে আয়’।

স্নানের পর ধোয়া জামা পরে ব্রতকারীরা জমা হয় তুলসী মণ্ডপে। এক ঘটি ভর্তি জল আর সাথে দেওয়া হবে বিজোড় সংখ্যার আম্রপল্লব। যেহেতু আরাধ্য ভগবান নারী, তাই কুলোর মধ্যে নুন দিয়ে আঁকা হয় স্বস্তিক চিহ্ন। দেবীর ভোগ বলতে খেসারির ডাল, নারকেল আর কলা আর সঙ্গে ফল ও ঘরে বানানো মিষ্টি। বাড়ির সকল মেয়ে-বউরা হাতে দূর্বা ও ফুল নিয়ে শোনে ব্রতের কথা। ব্রতের শেষে উলু ও শঙ্খ বাজিয়ে সবাই বলে উঠল ‘বুরা গিয়া ভালা আ, আপদ বলাই দূরে যা, মশা-মাছি দূরে যা’।

পূজার শেষে রান্না করা হয় গারুর ডাল। এই দিন বাড়ির মেয়েরা গারুর ডাল আতপ চাল বা কাওন চাল, ঘি দিয়ে খাবে এমনই দস্তুর। আবার কোথাও কোথাও ভাতের সঙ্গে গুড়, নারকেল, কলা খাবারও প্রচলন আছে। আশ্বিনে রান্না করা ভাত ও গারু ডাল পরের দিনের জন্য তুলে রাখা হবে মাটির হাঁড়িতে। পরের দিন পয়লা কার্তিকে বাড়ির সকল সদস্যরা কাঁচা হলুদ ও নীল পাতা দিয়ে স্নান করে এসে ভক্তি ভরে খাবে গারু দেবীর প্রসাদ আর বলবে –

‘আশ্বিনে রান্ধে কার্তিকে খায়
যা বর মাঙ্গে সেই বর পায়।’

তবে সব বছরের বাংলা মাসে এই পুজো হয় না। যে বছর লক্ষ্মী পূজা আশ্বিনের প্রথম দিকেই হয়ে যায়, সেই বছরই হয় এই ব্রত। সন্ধ্যায় সময় আবার বাড়ির সদস্যরা জমা হয় তুলসীতলায়। কুলোর স্বস্তিক আঁকা নুন ও ঘট পুকুরের জলে বিসর্জন দিতে হয়। তার পর সবাই মিলে ধুনচি, লাঠি, পাট কাঠিতে আগুন দিয়ে, কাঁসি, শঙ্খ, নিমের ডাল আর অর্জুন গাছের ডাল নিয়ে ব্রতের কুলোতে বাড়ি মেরে বাড়ির চারপাশে ঘুরে ঘুরে মশা-মাছি রোগ জীবাণু বাড়ি থেকে দূর করে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে ধূসর বিবর্ণে ভরা ঋতু হেমন্ত। এই ঋতু সুফলা নয়। মৌসুমী কোনও শস্য বা আনাজ আমরা এই ঋতুতে পাই না। বর্ষা ও শরতে কখনো অনাবৃষ্টি আবার কখনো অতিবৃষ্টির কারণে এই ঋতু বরাবরই নিষ্ফলা থাকে। তাদের জমানো ধানচাল আর শস্যদানায় টান পড়ে। কৃষকের ঘরে আর গোলায় চাল থাকে বাড়ন্ত। এই সময়টায় শাক সবজি ফলমূলের ও আকাল। তাই এই ব্রতের আয়োজন।

গ্রাম বাংলায় কোথাও কোথাও ব্রত পালনের পরের দিন ফসল যাতে ভালো হয়, অফলা গাছে ফলন যাতে ফিরে আসে তার জন্য দোহদ দান উৎসব পালন করে। পয়লা কার্তিক প্রত্যূষে কাঁচা হলুদ এবং শুন্দি একত্রে বেটে সরিষার তেল মিশিয়ে ধানগাছে মাখিয়ে দেওয়া হয়। নীরোগ স্বাস্থ্যের তেলাকচুর পাতা, আমগুরুজের লতা, হলদি, পান বেটে সেই গাছকে স্নান করাতে হয়। অফলা গাছে ফল ফলানোর আশা করে গাছের ডালে শামুকের মালা ঝুলিয়ে দেওয়া বা গাছটি কেটে ফেলার অভিনয়ও করা হয়। তখন মুখে মুখ বলা হয় ‘–আর কেটো না আর কেটো না রাশি রাশি ফল হবে’। তারপর গাছের গোড়ায় ব্রত ঘটের জল ছিটিয়ে দেওয়া দিতে হয়। আর সাথে মশা-মাছি দূর করার জন্য শুকনো খড়, জঙ্গল কেটে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া পোকার উৎপাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য ঘরের বাইরে উঠোনে একটা হারিকেন রাতভর জ্বেলে রাখাই রীতি। সেই আলোর আকর্ষণে পোকারা এসে জড়ো হয় আকাশপ্রদীপের চারদিকে আর মানুষ থাকে শান্তিতে।

তাই বলতেই হয় এই ব্রতের আড়ালে এক দিকে যেমন ধরা থাকে ফলনের অভিলাষ, অন্যদিকে ধরা থাকে রোগ জীবাণু ও মশা মাছি মুক্ত গ্রাম পরিবেশ রক্ষা করার মনস্কামনা। আজকের বাংলা যখন মশা মাছিবাহিত ডেঙ্গু ও নানা জ্বরে আবার আক্রান্ত তখন মনে হয় গ্রাম বাংলার মা বোনেরা যে ব্রত পালন করছেন তা কেবল মাত্র একটি সংস্কার নয়, এর আড়ালে লুকিয়ে থকে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ চেতনারও আরেকটি দিগ্‌দর্শন।

এই ‘গারসী সংক্রান্তি’ থেকে কার্তিক পূজার দিন পর্যন্ত একমাস বাংলাদেশের প্রতি বাড়িতে দেওয়া হয় ‘আকাশ প্রদীপ’। উঠানের এককোণে মস্ত উঁচু একটি বাঁশ পুঁতে, কপিকল তৈরি করে তার সাহায্যে এই বাঁশের মাথায় তুলে দেওয়া হয় ‘আকাশবাতি’। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে এই আলো দান করা হত। এই ব্রত হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পালন করে থাকে। অবশ্য নিয়ম ও পালন প্রথার কিছু অদল-বদল থাকে। মুসলমান গৃহস্থঘরে গ্রামের বন-জঙ্গল থেকে তেলাকুচার পাতা, আমগুরুজের লতা, হলদি, পান, সুপারি, বড় কচুপাতা, মেথি, তালের আটি, নারকেল, সিন্দা, কলাপাতার কাজল তোলার ছোট ডাটি সংগ্রহ করা হয়। উঠানের একটা জায়গা গোবর দিয়ে লেপ দেওয়া হয়। সেখানে এই সংগৃহীত ডাল-লতাগুলি রেখে একটা বড় কচু পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। সারা রাত সাজানো কচু পাতার চারিদিকে ঘুরে ঘুরে চলে জয় গান। জ্বালানো হয় আগুন। আফলা গাছে কোপ দিয়ে ফলনের জন্য প্রার্থনা করা হয়। পরের দিন সকালে বাড়ির সবাই সুন্দ্রা মেথি, আমগুরুজের লতা, তেলাকুচের পাতা ও হলদী- পাটায় বেটে গায়ে মেখে স্নান করে আসে। স্নান করার পর কলার ডাঁটের পাতায় তোলা আগের দিনের আগুনে পাতা সুরমা পড়ে তাল শাঁস, নারকেল, গুড় ও চিড়ামুড়ি খাওয়া হয়। এই দিন জায়গায় জায়গায় শারীরিক কসরত মুলক নানা প্রতিযোগিতা হয়। যারা খেজুর রস পাড়ত তারা সেদিন একটা খেজুর গাছের ডগা কেটে আসন্ন শীতকালে যাতে ভালো রস পাওয়া যায় তার প্রার্থনা করত। কী অসাধারণ মিল গ্রাম জীবনের চর্চায়! তা আমাদের বলে দেয় গ্রাম জীবনে সম্প্রদায় থাকে সাম্প্রদায়িকতা সেখানে ছায়া ফেলে না।

দেশ ও এই সময়

24×7 NATIONAL NEWS PORTAL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *