বিষয় বিষ : সাপের কামড়, ধর্মের ছোবল

দীপক চক্রবর্তী
(ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির সদস্য )

‘সাপ’ শব্দটির সাথে অদ্ভুত এক ‘ভয়’ শব্দ জড়িয়ে আছে। হঠাৎই যদি কাউকে বলা যায় – “ওই যে সাপ”, আমার মতো
অনেকেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠবেন, জানি। দিনের বেলা যদিও বা ‘সাপ’ উচ্চারণ করা গেল, তো রাতের বেলা অসম্ভব। রাত হলেই সাপ শব্দটি পাল্টে গিয়ে হয়ে যাবে ‘লতা” বা “দড়ি” !
সাপকে ঘিরে বাঙালি সমাজে গল্পগাথা বিস্তর। গল্পগুলো পড়তে বেশ মজা এবং ভালোই লাগে, কিন্তু বিপদটা সেখানেই, যখন আমরা সেই গল্প-গাথাগুলোকে সত্যি বলে ধরে নিই। কয়েকদিন আগেই “বাংলার লোকসংস্কৃতি’ নামক একটি বই পড়তে পড়তে জানলাম সাপ নিয়ে নানান গল্পগাথা। নতুন একটি কথা জানলাম, গোখরো সাপ নাকি জাতিতে ব্রাহ্মণ ! সেদিন থেকেই মাথার মধ্যে কিলবিল করছে – কেউটে, চন্দ্রবোড়া, কালাচ এরা তাহলে জাতিতে কী ! এমনিতেই ধর্ম-বৈষম্যের ঠেলায় আমাদের দেশের নেতারা নতুন এক সভ্যতার জম্ম দিচ্ছেন — নাগরিক আর বেনাগরিক ৷ আর তা দেখে আধুনিক সমাজ যতই মুচকি
হাসুক, আগামীদিনে হয়ত গোখরো সাপের মৃত্যু হলেও ব্রান্মণের মৃতদেহের মতো এই সাপটিকেও সৎকার করতে হবে । বাপের যদি শ্রাদ্ধ হয়, সাপের কেন নয় ? নিশ্চই সবাই ভাবছেন, আমি আবার এসব কি শুরু করলাম ! বিশ্বাস করুন, লিখতে চাইছিলাম অন্যকিছু — মূলত গ্রাম বাংলার সাপ নিয়ে লোকসংস্কৃতির কিছু কথা। শুরুটা সেভাবেই করেছিলাম, কিন্তু হঠাৎই কলম চেঁচিয়ে উঠল, দিল্লি চল!
ইয়ে, সাপের শ্রাদ্ধের যে কথাটা বলছিলাম, পুরো মিথ্যে নয় কিন্তু ৷ আমাদের প্রতিবেশী দেশটির খুলনা যশোহর এইসব জেলায় নাকি সব রকম সাপকেই মানুষের আত্মীয় বলে মনে করে | যদি কোনো সাপ মারা যায় এবং কেউ যদি মনে করেন তার যথারীতি সৎকার করতে হবে তবে হিন্দু ধর্মের সৎকারের মতোই তা পালন করা হয় । এমনকি মুখাগ্নি সহ !
এই দেখুন, যতবারই মূল বিষয়ে আসতে চাইছি, কলম ছুটছে অন্য দিকে । মন যেন বারবার বলছে, প্রকৃতির সাপ নিয়ে এত ভয়ের কি আছে, এই বিষয়ে মানুষ তো আজকাল বেশ সচেতন । আর চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে, সাপে কাটলে মা মনসার দুয়ারে হত্যে দেবার বা সর্পাহতকে কলার ভেলায় চড়িয়ে নদীতে ভাসানোর দিন আর নেই । এত সব বিচিত্র সাপের মধ্যে ওই তো মাত্র গুটি কয়েক বিষধর, কাউকে কামড়ালে উপসর্গ ও লক্ষণ দেখে ‘আ্যান্টি ভেনম সিরাম’ চালু করলেই হয় । কিন্তু ধর্ম নামক যে বিষাক্ত সাপ এই সমাজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তার কামড়ের প্রতিষেধক কোনও “সিরাম’ আছে কি?
কোনও সাপ ধর্মমোহে আবদ্ধ হয়ে ছোবল মারছে আবার কোনও সাপ নিজের ঔদ্ধত্য, ক্ষমতা জাহির করতে বিষ থলির পুরো বিষ উগড়ে দিচ্ছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের শরীরে। হ্যাঁ এরা এতটাই ধর্মের বিষ ধারণ করে বসে আছে যে, মনসা মঙ্গল কাব্যের কথা শুনলেও ভাবছে এই বুঝি বিধর্মী সেকুলার নাস্তিকরা তেড়ে এলো । কিন্তু, নাস্তিকরা তো ভাই কাউকে খুন করতে আসে না, এরা বিজ্ঞানের কথা বলে, সাপ কামড়ালে হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলে । সকল মানুষের মত প্রকাশের অধিকারের
কথা বলে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে । বিষাক্ত সাপের মত সমস্ত বিষ উগরে দিয়ে শেষমেশ ওঝাকে পাঠিয়ে চিকিৎসার কথা বলে না । জানিনা, ওপার বাংলার কেউ সাপ নিয়ে লোককথা লিখতে গিয়ে শেষমেশ আমারই মতো এমন খেই হারিয়ে অন্য কিছু লিখে ফেলবেন কিনা ।
স্বপ্ন দেখি আজও, নতুন এক ভারতবর্ষকে দেখবো বলে । ভীষণ কষ্ট হয় ভাবতে, যাঁরা আমাদের দেশকে ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীন করার জন্য নিজেদের জীবন হাসিমুখে উৎসর্গ করেছিলেন, কোন ভারতের স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতার লড়াই করেছিলেন তাঁরা? দেশ জ্বলছে দেখেও যাঁরা এখনো ভোটের হিসেব কষছেন, তাঁরা জানেন না, সেই হিসেবের খাতাও কিন্তু এই আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে । সকল জাতি, ধর্ম, ভাষা, নানান বৈচিত্র নিয়েই তো এই ভারতবর্ষ, যা আমাদের গর্ব । এই বৈচিত্র্য মুছে ফেলে একটিমাত্র ধর্মের কজায় সব কিছু নিয়ে এলেই আমাদের সব সমস্যা মিটে যাবে ? হিন্দু ভারত হলেই আম-হিন্দুর সব সমস্যা মিটবে ? প্রতিবেশী পাকিস্তান তো ইসলামের দেশ, সেখানে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন না, ওই ইসলামিক দেশের সংখ্যা-
গরিষ্ঠ সরলবিশ্বাসী গরিব মুসলমানরা ঠিক কেমন আছেন ?
হ্যাঁ, আমি নাস্তিক ও মানবতাবাদী একজন সাধারণ মানুষ, আমার কাছে আজানের সুর আর শঙ্খ ধ্বনির কোনও পার্থক্য নেই । ব্যক্তিগত ভাবে আমি মানিনা কোনও ধর্মীয় অনুশাসন, আবার তাই বলে মন্দির মসজিদ ভাঙার পক্ষেও আমি নই । আমি অধার্মিকতায় বিশ্বাসী একজন নাস্তিক হয়েও কেউ মন্দির মসজিদ ভাঙতে এলে রুখে দাঁড়াবো।
অনেক দিন আগে এই লেখাটা লিখেছিলাম ফেসবুকে দেবো বলে, শেষমেশ আর পোস্ট করিনি । প্রকৃতির সাপ নিয়ে তো অনেক গানই গেয়েছি, আজ না হয় একটু অন্য সুরেই গাইলাম । বর্তমান এই পরিস্থিতিতে যখন দেখি কে কোন ফুলে ভোটদেবতাকে তুষ্ট করা যায় তার প্রতিদ্বন্দিতায় নেমেছেন, তখন মনে হয় বিষধর সাপের মতো এরাও আসলে খোলসই পাল্টাচ্ছেন।
দিল্লির রাজপথে এই কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও কৃষকরা কেন্দ্রীয় কৃষি বিলের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন অথচ সাপের শীতঘুমের মতো আমরা লেপ কাঁথার নিচে আরামে নিদ্রাাপন করছি । সাপের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের বিষয়ে এর চেয়ে কিছু বলার সাহস আর পেলাম না, বিশ্বাস করুন !

দেশ ও এই সময়

24×7 NATIONAL NEWS PORTAL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *