সিঙ্গুরের ডাকাত কালী

হুগলী: অমাবস্যার রাত। চারিদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে রণ পা পড়ে হেটে চলেছে একদল মানুষ। তারা সাধারণ কেউ না, ডাকাত। হুগলীর ডাকাত কুখ্যাত ছিল। ছিল মানুষের ত্রাস। চিতে ডাকাত, বিশে ডাকাত, রন ডাকাত , রঘু ডাকাত , গগন ডাকাত এদের ভয়ে ডরাত সবাই। রাঢ় বঙ্গীয় অঞ্চলে তাদের রাজ চলত। মনে করা হয় তাদেরই পুজা করা কালী আজকের সিঙ্গুরের মা সিদ্ধেশ্বরী। লোকমুখে তিনি ডাকাতে কালী নামে প্রসিদ্ধ। কত নিরীহ লোককে তার কালীবাড়িতে এনে হত্যা করা হত। সে নানা স্থানে ডাকাতি করে বেড়াত। অনেকের মতে এটি রঘু ডাকাতের কালী। কেউ বলেন এর নির্মাতা গগন সর্দার।কেউ বলেন চিতে কালী (চিতু ডাকাতের কালী, যার নামে কলকাতার চিতপুর অঞ্চল) সে যাই হোক; এই রাস্তা দিয়েই একদা শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে দেখতে মা সারদা দেবী কামারপুকুর থেকে দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছিলেন। কামারপুকুর থেকে তারকেশ্বর হয়ে আসার সময়ে শরীর ক্লান্ত হওয়ায় সিঙ্গুরের পুরুষোত্তমপুর লাগোয়া সরস্বতী নদীর ধারে একটি বটগাছের তলায় বিশ্রাম করছিলেন। বিশ্রাম করার সময়ে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে যায়।ওই সময়ে রঘু ডাকাত ও গগন ডাকাত সারদা মায়ের কাছে থাকা পুঁটলি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুঁটলিটি কেড়ে নেওয়ার জন্য টানাটানি করার সময়ে দুই ডাকাত সারদা মায়ের পিছনে রক্তচক্ষুর দেবী কালীর দর্শন পায়। এরপরেই ডাকাতরা সারদা মা’কে সসম্মানে তাদের আস্তানায় নিয়ে যায়। সারদা মা’কে রাতে চাল কড়াই ভাজা খেতে দেয় তারা। তারপর থেকেই ডাকাতদের নির্দেশে চাকলপুর গ্রামের মোড়লরা মায়ের মূর্তি তৈরি করে কালীপুজোর প্রচলন করে। পরবর্তী সময়ে, দেবীর স্বপ্নাদেশে, বাংলার ১২৯৭ সালে বর্ধমানের রাজা পুরুষোত্তমপুরে মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।এই ডাকাত কালী মন্দিরটি পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার সিঙ্গুরের পুরুষোত্তমপুরে অবস্থিত। অতীতে এই জায়গাটাই ছিল সিংহপুর। বাংলার প্রায় সাড়ে সাতশো বছর ধরে রাজধানী ছিল সিংহপুর – বর্তমানে হুগলী জেলার একটি খুব ছোট শহর। সেই সিংহপুরের রাজা ছিলেন সিংহবাহু, তাঁর পুত্র বিজয়সিংহ লঙ্কা জয় করে লঙ্কার নাম পাল্টে সিংহল রেখেছিলেন। তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র পান্ডু বাসুদেব কে আবার সিংহপুর থেকে নিয়ে গিয়ে সিংহলের ও কেরলের রাজা করে দিয়েছিলেন। সেটা পাঁচশো চৌত্রিশ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ, অর্থাৎ আড়াই হাজার বছর আগে। এই সিংহপুরেরই এক রাজপুত্র ছিলেন সহস্রবাহু, যিনি তাই দেশ জয় করে নাম দেন শ্যামদেশ। হুগলীর সিঙ্গুর রেলস্টেশনের কাছেই ডাকাতের এই সিদ্ধেশ্বরী কালী।সিদ্ধেশ্বরীর সঙ্গে ‘সিদ্ধি’ শব্দটি জড়িয়ে আছে। শব্দটির আভিধানিক অর্থ একাধিক; যেমন সফলতা, জয়লাভ করা, অভীষ্ট লাভ করা অথবা যোগ বিশেষ ইত্যাদি। সাধক নির্দিষ্ট লক্ষে এই কালীরূপের সাধন ভজন করতেন। যোগ সাধনায় অষ্টসিদ্ধিলাভ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টসিদ্ধি হলো আট প্রকার সিদ্ধিলাভ। যেমন অণীমা — এই সাধনায় সাধক সিদ্ধিলাভ করলে অনুর মতো ক্ষুদ্র আকার ধারন করতে পারেন। আবার গরীমা হলো অণীমার বিপরীত। ইচ্ছে করলে সিদ্ধিপ্রাপ্ত সাধক সুবিশাল বপুর অধিকারি হতে পারেন। লঘীমা আবার বায়ুর মতো হালকা হয়ে যাওয়ার সাধনা। ঈশিতায় সিদ্ধিলাভ করলে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যায়। প্রাকাম্য হলো — বাসনা চরিতার্থ করার সাধনা আর কামবসিতায় সাফল্য পেলে সাধক ইচ্ছানুযায়ী যে কোন রূপ ধারণ করে পার্থিব কামনা বাসনা পূরণ করতে পারেন।এই অষ্টসিদ্ধিকে প্রকৃত সাধকরা আবার তাঁদের সাধক-জীবনের উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক রূপেই দেখেন। কালী উপাসকদের মধ্যে অঘোরপন্থী কাপালিকরা ছিলেন অন্যতম। শ্মশানে বনে জঙ্গলে কালীসাধনা করতেন। এঁরাই ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী কালীর প্রতিষ্ঠাতা। সিদ্ধেশ্বরী মূলত গৃহস্থরা পুজো করেন না। এইধরনের শাক্তসাধকরা অষ্টসিদ্ধি লাভের জন্য সিদ্ধেশ্বরীর উপাসনা করতেন। এছাড়া সিদ্ধেশ্বরীর উপাসক ছিলেন চোর ডাকাতরা।এই ডাকাত কালী মন্দিরের দেওয়ালে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, বিষ্ণুর দশাবতারের মূর্তি ও পোড়ামাটির লতাপাতা খোদিত রয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রায় নয় ফুট উচ্চ বিগ্রহ অবস্থিত। মন্দিরের গর্ভগৃহে চর্তুভূজা দেবীর মূর্তি এককথায় অসাধারণ।প্রাচীন রীতি মেনে কালীপুজোর দিন দুপুরে শূদ্রদের আনা গঙ্গাজল দিয়ে প্রতি বছর ঘটের জল পরিবর্তন হয় সিঙ্গুরের পুরুষোত্তমপুর মন্দিরে। এই প্রাচীন কালীমন্দিরে অতীতে নরবলি হতো এমনটাও জনশ্রুতি আছে। আজও অমাবস্যার বিশেষ তিথি সহ প্রতিদিন পূজা পান সিঙ্গুরের এই বিখ্যাত সিদ্ধেশ্বরী কালী। তবে প্রাচীন রীতি মেনে মন্দির প্রতিষ্ঠার পরেও এখনকার মায়ের প্রধান নৈবেদ্য হল চাল কড়াই ভাজা ও কারণ বারি।

দেশ ও এই সময়

24×7 NATIONAL NEWS PORTAL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *