গরীবের ডাক্তার মৃণালকান্তি দেবনাথ

শুভদীপ দাস এর প্রতিবেদন

এ এক পরিশ্রমী মানুষের সকলের কাছে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।

১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের খুলনা জেলায় আভিজাত্যপূর্ন পরিবারে জন্ম হাবরার সুপরিচিত ডাক্তার ও গরীবদের মানুষরুপী ভগবান ড.মৃণালকান্তি দেবনাথের। আজকের এই সুপরিচিত মানুষটির পেছনে রয়েছে এক সুবিশাল ইতিহাস, রয়েছে তার একার লড়াই।অষ্টম শ্রেণী অবধি পড়াশুনো তার গ্রামেই। তারপর বাবার ইচ্ছেতে উচ্চশিক্ষা লাভের আশায় আসেন খুলনার শহরে। এমতবস্থায় ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশে রায়টের ফলে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বে তিনি যে গৃহে থেকে পড়াশুনো করতেন, সেই গৃহে আগুন লাগে। অত্যন্ত ভীত হয়ে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান, কিন্তু সেখানেই দুজনের মৃত্যু ঘটে। ড.মৃনালকান্তি বাবু তখন সেই শহরে নতুন, তাই বাড়ির পথ খুঁজে না পেয়ে এক নৌকায় ওঠেন এবং সেই নৌকার মাঝিকে তার বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন।কিন্তু মাঝি সেই ঠিকানা চিনতে না পেরে তাকে সংগে করে এদেশে নিয়ে আসেন। ড.মৃণালকান্তি বাবু পা রাখেন এদেশের মাটিতে, এসে ওঠেন তেঁতুলিয়ায়। হঠাৎ তার মনে পড়ে হাবরায় তাদের একটি বাড়িসহ জমি আছে যেটি কিনা তার বাবার এক বন্ধু রক্ষনাবেক্ষন করছেন। কিন্তু তেঁতুলিয়া থেকে বাস ভাড়া করে হাবরা যাওয়ার পয়সা যে নেই। করলেন মুটেগিরি, যে দুটি পয়সা পেলেন তা নিয়ে চললেন হাবরা। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে বাবার বন্ধুর স্ত্রীর গঞ্জনায় তার বাবার কেনা বাড়িতেও ঠাই হলোনা। কোনোরকমে পেছেনে ভাড়ার ঘরে আশ্রয় পেলেন। ওদিকে তার বাবা ও তখনকার প্রথানুযায়ী অল্পবয়সীর বাগদত্তা তথা তার পরিবারে তাকে মৃত বলেই জানতেন এবং তারাও হাবরা আসেন। কিন্তু এর মধ্যে তাদের ওই বাড়িটি বাবার বন্ধু অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়ে চলে যান। ফলে তারা দমদমে এক জায়গায় আশ্রয় নেন। এদিকে ড.মৃনালকান্তি বাবু কিছু ভালো মানুষের সানিধ্য পান ও তাদের সাহাযার্থে প্রফুল্লনগর বিদ্যামন্দিরে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৬৬ সালে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেন এবং অবিভক্ত ২৪ পরগনায় প্রথম স্থান লাভ করেন। তিনি কেন্দ্রীয় মেধাবৃত্তি পান ও তখনকার পত্রিকায় তার নাম ওঠে, যেটি তার সেই বাগদত্তা দেখতে পান।

এরপর তার পরিবার খোঁজ করতে করতে যখন হাবরা আসেন তখন তিনি মঞ্চে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার নিচ্ছিলেন। একদিকে সাফল্যের পুরস্কার অন্যদিকে পরিবারের সংগে এতবছর পর সাক্ষাৎ। আজ সেউ স্থানেই তার নিজস্ব চেম্বার। এরপর তিনি ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি নিয়ে পড়াশুনো করেন, তারপর দিল্লী যান ও চাকরিও পেয়ে যান দক্ষিন আমেরিকায়। এছাড়াও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইউনিভার্সিটি থেকে ড্রাগের ওপর গবেষণা করেন। জেনারেল মেডিসিনের ওপর “মেডিকেল ফেলো” করেন, মনোরোগ এর ওপর বিশেষ কোর্স করেন। বহু দেশ-বিদেশ ঘুরে অবশেষে আন্দামানে বাড়ি করেন, যদিও সেখানে বসবাস করতেন না। কেবলমাত্র ৩০শে ডিসেম্বর আন্দামানের স্বাধীনতা দিবসে পতাকা উত্তোলন করতে যেতেন তার বাড়ির এলাকায়। ডাক্তারির পাশাপাশি তিনি নেতাজি সম্পর্কিত কাজ করেন ও ২০১৪ সালে “নেতাজি ভাবনা জাগরণ পরিষদ” নামক সংস্থা গঠন করেন, যার প্রধান কাজ গরীব রোগীদের সাহায্য করা। এরজন্য তিনি “রুরাল মোবাইল মেডিকেল সার্ভিস” চালু করেন, এটি একটি ভ্রাম্যমাণ যান যাতে মেডিকেলের সমস্ত সরঞ্জাম বর্তমান।

প্রতি শনিবার ড. মৃণালকান্তি দেবনাথ গরীবদের চিকিৎসায় বেরিয়ে যান। এভাবেই তিনি হাবরা তথা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন, সকলের কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন।

দেশ ও এই সময়

24×7 NATIONAL NEWS PORTAL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *