বিদায় নিচ্ছে শীত আসছে গরম, এটাই কিন্তু এদের সময়!

শীত শেষ। সেই সাথে বসন্তও। গতকয়েকদিন ধরেই তাপমাত্রার পারদ উর্ধ্বমুখী। আর এই গরমের সময় বিভিন্ন জিনিসের যেমন সন্মুখীন হতে হয় আমাদের তার মধ্যে অন্যতম গ্রাম বাংলায় সাপের কামড়।

গত বছর এই সাপের কামড়ে মৃত্যুতে এই রাজ্য সারা দেশের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে। কামড় খেয়েছে আগের তুলনায় বেশী। কেন ঘটে এত মৃত্যু?

তার আগে আসুন দেখি কোন কোন সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় এ রাজ্যের মানুষের! আসলে আমাদের পশ্চিমবঙ্গে অনেকগুলো প্রজাতির সাপ বসবাস করলেও মূলত ছয় ধরনের বিষধর সাপ দেখতে পাওয়া যায়। বাকি সাপগুলোর বেশিরভাগই নির্বিষ। আর কয়েকটি সাপের সামান্য বিষ থাকলেও তা তার শিকারকে নিস্তেজ করতেই সাহায্য করে কিন্তু তা কোনোভাবেই মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে না।

বিষধর ছয় প্রজাতি হল- কেউটে, গোখরো, কালাচ, চন্দ্রবোঁড়া, শঙ্খচূড়, শাঁখামুটি।

গোখরো (Spectacled Cobra)

ছবি সৌজন্যে: ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি

ফণাধর ও নার্ভবিষযুক্ত৷ এদের ফণার পিছনে ইংরাজি ইউ ‘U’ অক্ষরের মতো একটি চিহ্ন থাকে৷ যাকে খড়ম চিহ্নও বলা হয়৷ এদের কামড়ে ক্ষতস্থানে প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং ক্রমাগত ফুলতে থাকে৷ এদের স্থানীয় নাম খরিস৷ বিজ্ঞানসম্মত নাম Naja naja । এর কামড়়ে (১৫ – ১৮ মিলিগ্রাম পর্যন্ত বিষে) একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে৷

কেউটে (Monocled Cobra)

ছবি সৌজন্যে: ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি

ফণাধর ও নার্ভবিষযুক্ত৷ এদের ফণার পিছনে থাকে পদ্মচিহ্ন ৷ এদের স্থানীয় নাম আলকেউটে, কালকেউটে, শামুকভাঙা৷ বিষের মারণডোজ ১৫ মিলিগ্রাম৷

চন্দ্রবোঁড়া (Russell’s viper)

ছবি সৌজন্যে: ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি

এই সাপের বিষ রক্তকণিকা ধ্বংস করে৷ এটি বাংলার একমাত্র হিমোটক্সিক সাপ৷ এই সাপ সবথেকে বেশি প্রাণ কাড়ছে বাংলায়৷ সাপটি মোটা চেহারায়৷ বাদামি বা কাঠ রঙের৷ ফণাহীন সাপ৷ গায়ে চন্দন হলুদ চাকা চাকা দাগ৷ এরা কামড়ালে রোগীর রক্ততঞ্চনের গন্ডগোল হয়৷ চিকিৎসায় দেরি হলে রোগীর কিডনি নষ্ট হতে থাকে৷ মূত্রে রক্ত এসে যায়৷

কালাচ (Common krait)

ছবি সৌজন্যে: ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি

এশিয়া মহাদেশের অন্যতম ভয়ংকর বিষধর এবং রহস্যময়ী সাপ- এই কালাচ। ফণাহীন মাঝারি চেহারার এই সাপটির গায়ের রং কালো, তার উপর সরু সরু সাদা ব্যান্ড৷ দিনের বেলা এদের প্রায় দেখাই যায় না৷ রাতে এরা খোলা বিছানায় উঠে আসে৷ বাংলায় যে কয়টি সাপ রয়েছে তার মধ্যে এই সাপ বেশি বিপদজনক। কারণ এর দাঁত এত ছোট হয় যে এর কামড় মালুম হয়না। প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে পেটে ব্যাথা শুরু হয়। অজান্তে এই সাপের কামড় খাওয়ায় অনেকেই না বুঝে ডায়রিয়া হয়েছে বলে ভুল করেন। কারণ পেট ব্যাথার সাথে অনেকক্ষেত্রে পাতলা পায়খানা ও বমির উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক সময় নির্বিষ ঘরচিতি সাপের সাথে কেউকেউ এই সাপটিকে গুলিয়ে ফেলেন।

বাকি রইল দুই,

শাঁখামুটি সাপটি বিষধর হলেও এই এতই শান্ত প্রকৃতির যে সহজে মানুষকে কামড়ায় না। শাঁখামুটি সাপে কামড়ে কেউ মারা গেছেন বা এই সাপটি কাউকে কামড়েছে এমন পরিসংখ্যান খুবই নগণ্য। উল্টে এই সাপটি কালাচ ও চন্দ্রবোঁড়া সাপকে খেয়ে মানুষের উপকারই করে বটে। শাঁখা মুটি গায়ে হলুদ ও কালো ব্যান্ড থাকে যা দেখে তাকে সহজেই চেনা যায়।

শঙ্খচূড় বা রাজ গোখরো পশ্চিমবঙ্গের সমতল ভূমিতে পাওয়া যায় না। উত্তরবঙ্গের গভীর জঙ্গলে এই প্রজাতির কয়েকটি সাপ দেখা মেলে তবে তারা লোকালয় এড়িয়ে চলে গভীর জঙ্গলে থাকতেই পছন্দ করে। তবুও দুর্ভাগ্য বশত কাউকে কামড়ায় তবে তার শরীরে একটি কেউটে বা গোখরো সাপের তুলনায় দশগুন বেশী বিষ ঢালে। তাই তাকে বাঁচাতেও সাধারণের থেকে দশগুন বেশী এন্টিভেনাম প্রয়োজন।

রুল অফ ১০০

সাপে কামড়ানোর ১০০ মিনিটের মধ্যে ১০০ মিলিলিটার ASV শরীরে প্রবেশ করালে রোগী বেঁচে যাবে৷

প্রাথমিক চিকিৎসা

RIGHT’ ফর্মুলা মাথায় রাখতে হবে৷

R(Reassurance)–প্রথমে রোগীকে আশ্বস্ত করতে হবে৷ কারণ রোগী খুবই আতঙ্কের মধ্যে থাকেন৷ আতঙ্ক মৃত্যু ডেকে আনতে পারে৷ রোগীকে বোঝান সাপের কামড়ে আক্রান্ত বহু মানুষ চিকিত্সার ফলে বেঁচে উঠেছে৷ আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন৷
I(Immobilization)–যত কম নাড়াচাড়া হবে, তত কম হারে বিষ সারা শরীরে ছড়াবে৷ স্কেল বা বাঁশের টুকরো সহ হাতে বা পায়ে (যে অংশে কামড়াবে) কাপড় দিয়ে হাল্কা করে বেঁধে দিন৷ হাত বা পা যাতে তিনি ভাঁজ করতে পারেন তাই এই ব্যবস্থা৷
GH(Go to Hospital)–ফোন করে জেনে নিন আপনার নিকটতম হাসপাতালে ASV, নিওস্টিগনিন, অ্যাট্রোপিন এবং অ্যাড্রিনালিন আছে কি না৷ মাথায় রাখবেন, সাপের কামড়ের সম্পূর্ণ চিকিৎসা একটি ব্লক প্রাইমারি হেল্থ সেণ্টারেই সম্ভব৷
T(Tell Doctor For Treatment)–হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসককে সাপের কামড়ের চিকিৎসা করতে বলুন৷ রোগীর কথা জড়িয়ে যাওয়া, নাকি সুরে কথা বলা, চোখের পাতা পড়ে আসা এগুলি লক্ষ্য করতে চিকিৎসককে জানান৷

কী করবেন

  • শান্ত থাকবেন
  • কাছাকাছির মানুষজনকে ডাকবেন৷
  • হাতে ঘড়ি বা চুড়ি, বালা থাকলে খুলতে হবে৷
  • ক্ষতস্থান যত সম্ভব স্থির রাখতে হবে৷
  • যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে যেতে হবে৷

কী করবেন না

  • কোনওরকম বাঁধন দেবেন না৷
  • কামড়ের জায়গায় কোনও কেমিক্যাল লাগাবেন না৷
  • কামড়ের স্থানে ঠান্ডা, গরম, বরফ জল দেবেন না৷
  • কেটে চিরে বিষ বের করার চেষ্টা করবেন না৷
  • মনে রাখবেন, সাপ যখন কামড়ায় তার বিষ দাঁতের মাধ্যমে ইঞ্জেকশনের মতো শরীরের ভিতরে চলে যায়৷ বিষ পাম্প বলে একরকম অবৈজ্ঞানিক বস্তু প্রয়োগ করে ভোজবাজি দেখানো হচ্ছে৷ এগুলি সব অর্থহীন৷ উল্টে চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ের পর ক্ষতস্থান চিরলে মারাত্মক রক্তপাত হতে পারে৷
  • রোগী নিজে দৌড়ে বা সাইকেল চালিয়ে আসবেন না৷
  • সাপ ধরে হাসপাতালে আনার দরকার নেই৷

সাপ ঠেকাবেন কীভাবে?

  • বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন৷ কার্বলিক অ্যাসিড শরীরে লাগলে ক্ষতি হয় তাই ব্যবহার না করাই ভাল৷ চুনের সঙ্গে ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে ছড়িয়ে দিন৷ এর ঝাঁঝালো গন্ধে সাপ আসে না৷
  • রাতে অবশ্যই বিছানা ঝেড়ে মশারি টাঙিয়ে শোবেন৷ দরজা-জানলার নিচে ফাঁকা জায়গা কাপড় গুঁজে ভরাট করে রাখতে পারেন৷
  • অন্ধকারে হাঁটাচলা করবেন না৷ হাতে লাঠি নিয়ে রাস্তা ঠুকে চলুন৷ হাততালি দিয়ে লাভ নেই, কারণ সাপের কান (বহিঃ কর্ণ) নেই ফলে বাতাসে উৎপন্ন কোনো শব্দ শুনতে পায় না।
  • জুতো পরার আগে সেটা ঝেড়ে নিন৷ মাটির বাড়িতে ইঁদুরের গর্ত থাকলে তা বুজিয়ে ফেলুন৷

আসলে আমাদের দেশে এখনও বহু মানুষ সর্পদংশনের পর ডাক্তারদের তুলনায় ওঝা, ঝাড়ফুঁকের উপর বেশি ভরসা রাখে৷ ফলে রোগী গুরুত্বপূর্ণ প্রথম কয়েক ঘণ্টা (গোল্ডেন আওয়ার) বিনা চিকিৎসায় নষ্ট হয়ে যায়৷ সমীক্ষা অনুযায়ী সাপে কাটা রোগীদের মধ্যে মাত্র ২২ শতাংশ সরকারি হাসপাতালে আসেন৷ জনমানসে ভ্রান্ত ধারণার ফলেও অনেক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে৷

প্রতিবেদক: শুভদীপ দাস

দেশ ও এই সময়

24×7 NATIONAL NEWS PORTAL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *